Friday, July 31, 2026
Google search engine
Homeতথ্যপ্রযুক্তিফ্রিল্যান্সারদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে কী সুবিধা মিলবে

ফ্রিল্যান্সারদের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা, বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেনে কী সুবিধা মিলবে

দেশের ফ্রিল্যান্সার ও ব্যক্তিগত সেবা রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন আরও সহজ, দ্রুত ও গতিশীল করতে নতুন সমন্বিত রূপরেখা প্রণয়ন করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। আগে জারিকৃত বিভিন্ন নির্দেশনাকে একীভূত করে সম্প্রতি ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ পলিসি ডিপার্টমেন্ট’ থেকে সব অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকে এ–সংক্রান্ত এক সার্কুলার (এফইপিডি-১/২২) পাঠানো হয়েছে। নতুন এই নির্দেশনায় আইসিটি সেবা, বিপিও এবং অনলাইনে পেশাদার সেবা প্রদানকারীদের অর্থ প্রত্যাবাসন ও বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবহারের সুনির্দিষ্ট নিয়ম স্পষ্ট করা হয়েছে।

ইএক্সপি ফর্মে ছাড় ও ডিজিটাল নথি গ্রহণ

ইন্টারনেট বা ডিজিটাল মাধ্যমে সেবা রপ্তানির ক্ষেত্রে ভৌত বা ফিজিক্যাল পণ্যের মতো প্রথাগত ‘ইএক্সপি ফর্ম’ পূরণের বাধ্যবাধকতা তুলে নেওয়া হয়েছে। এখন থেকে প্রথাগত কাগুজে দলিলের বদলে ই-মেইল, ডিজিটাল চুক্তিপত্র, ই-ইনভয়েস, ফ্রিল্যান্সিং প্ল্যাটফর্মের ডিজিটাল স্টেটমেন্ট এবং ব্যাংকিং ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স বার্তাকে লেনদেনের বৈধ প্রমাণ হিসেবে গণ্য করতে পারবে ব্যাংকগুলো।

রেমিট্যান্সের উচ্চসীমা ও সি-ফর্ম শিথিলকরণ

নতুন নিয়ম অনুযায়ী, সর্বোচ্চ ২০ হাজার মার্কিন ডলার (বা সমপরিমাণ মুদ্রা) পর্যন্ত ইনওয়ার্ড রেমিট্যান্স গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো ‘সি-ফর্ম’ জমা দিতে হবে না। তবে লেনদেনের পরিমাণ ২০ হাজার ডলার অতিক্রম করলে গ্রাহকেরা নিরাপদ অনলাইন বা ডিজিটাল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে সহজ উপায়ে অনলাইন সি-ফর্ম পূরণ করে দ্রুত অ্যাকাউন্টে অর্থ জমা করতে পারবেন।

পেমেন্ট গেটওয়ে, ডুয়েল কারেন্সি কার্ড ও এমএফএস সুবিধা

* অনলাইন গেটওয়ে সীমা: স্বীকৃত অনলাইন পেমেন্ট গেটওয়ে সেবা প্রদানকারীদের (ওপিজিএসপি) মাধ্যমে প্রতি লেনদেনে সর্বোচ্চ ১০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত আয় দেশে আনা যাবে।
* ডুয়েল কারেন্সি কার্ড ও এমএফএস: ফ্রিল্যান্সাররা অনুমোদিত ব্যাংক থেকে ‘ডিজিটাল ডুয়েল-কারেন্সি ফ্রিল্যান্সার কার্ড’ নিতে পারবেন। এ ছাড়া বিকাশ ও রকেটের মতো মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) ও পেমেন্ট সার্ভিস প্রোভাইডারদের (পিএসপি) সাহায্যে সরাসরি নিজেদের ডিজিটাল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে সেবা আয়ের টাকা আনতে পারবেন।

ইআরকিউ অ্যাকাউন্টে ফরেইন কারেন্সি সংরক্ষণের সুযোগ

আইসিটি ও সফটওয়্যার খাতের রপ্তানিকারকেরা তাদের অর্জিত নিট আয়ের সর্বোচ্চ ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ‘এক্সপোর্টার্স রিটেনশন কোটা (ইআরকিউ) অ্যাকাউন্টে সরাসরি বৈদেশিক মুদ্রায় (যেমন মার্কিন ডলার) জমা রাখতে পারবেন। অন্যান্য পেশাদার সেবার ক্ষেত্রে এই সংরক্ষণের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩০ শতাংশ। অর্জিত আয়ের অবশিষ্ট অংশ স্থানীয় মুদ্রা টাকায় রূপান্তর করতে হবে।

ইআরকিউ অ্যাকাউন্টে সংরক্ষিত বৈদেশিক মুদ্রা দিয়ে সফটওয়্যার রেজিস্ট্রেশন, ডোমেইন বা হোস্টিং ফি, সার্ভার মেইনটেন্যান্স, বৈশ্বিক সরঞ্জাম আমদানি, পেশাগত বিদেশি ভ্রমণসহ বৈধ ব্যক্তিগত কাজেও খরচ করা যাবে।

বিদেশে আয় জমিয়ে রাখা শাস্তিযোগ্য অপরাধ

বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, অর্জিত রপ্তানি আয় বিদেশে অন্য কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, সম্পদ বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মতো ভার্চ্যুয়াল অ্যাসেটে জমিয়ে রাখা যাবে না। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদিত অ্যাকাউন্ট ব্যতীত বিদেশে আয় ধরে রাখা ‘ফরেন এক্সচেঞ্জ রেগুলেশন অ্যাক্ট, ১৯৪৭’-এর প্রত্যক্ষ লঙ্ঘন এবং আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ছাড়া ব্যাংকগুলোকে প্রতিটি লেনদেনের ক্ষেত্রে এএমএল/সিএফটি ও কেওয়াইসি নীতিমালা কঠোরভাবে মেনে চলা এবং যথাযথ উৎসে কর কর্তন নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

ফ্রিল্যান্সার বা মুক্তপেশাজীবীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে এবং আয় করতে পারেন

ফ্রিল্যান্সার বা মুক্তপেশাজীবীরা স্বাধীনভাবে কাজ করতে এবং আয় করতে পারেনফাইল ছবি: রয়টার্স

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যা বলছেন

বাংলাদেশ ব্যাংকের এই বৈপ্লবিক ও বাস্তবমুখী উদ্যোগের ফলে ফ্রিল্যান্সারদের দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক জটিলতা অবসান ঘটবে এবং দেশের তথ্যপ্রযুক্তি খাতের রপ্তানি আয় বহুগুণ বাড়বে বলে মনে করছেন বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব কন্ট্যাক্ট সেন্টার অ্যান্ড আউটসোর্সিংয়ের (বাক্কো) সাধারণ সম্পাদক ফায়সাল আলিম।

জায়ান্ট মার্কেটার্সের প্রতিষ্ঠাতা মাসুম বিল্লাহ ভূঁইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনা ফ্রিল্যান্সারদের জন্য অবশ্যই ইতিবাচক ও সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এখনো কিছু বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। বিশেষ করে ইআরকিউ অ্যাকাউন্ট এখনো অধিকাংশ ক্ষেত্রে শুধু এডি শাখা থেকেই খোলা যায়। জেলা শহরের অনেক শাখায় এই সুবিধা নেই বা কর্মকর্তারা প্রক্রিয়া সম্পর্কে অবগত নন, ফলে ফ্রিল্যান্সারদের অপ্রয়োজনীয় ভোগান্তি পোহাতে হয়।’

মাসুম বিল্লাহ ভূঁইয়া আরও বলেন, ‘এ ছাড়া সার্কুলারে ২০ হাজার মার্কিন ডলার পর্যন্ত সি-ফর্ম ছাড়ের কথা থাকলেও বাস্তবে সব বাণিজ্যিক ব্যাংক ৫০০ থেকে ১ হাজার ডলারের রেমিট্যান্সের ক্ষেত্রেও সি-ফর্ম পূরণ করতে বাধ্য করছে। নীতিমালা ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নের এই অসামঞ্জস্য দূর করা জরুরি। আশা করি, বাংলাদেশ ব্যাংক সার্কুলারের সঠিক বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে সব ব্যাংকের জন্য স্পষ্ট নির্দেশনা ও কার্যকর তদারকি জোরদার করবে।’

নতুন ফ্রিল্যান্সারদের জন্য চ্যালেঞ্জ কী কী

টপ রেটেড ফ্রিল্যান্সার ও টিম ম্যাভিনের কাজী মামুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন নির্দেশনায় ২০ হাজার ডলার পর্যন্ত সি-ফর্ম ছাড় এবং অর্জিত আয়ের ৫০ শতাংশ বৈদেশিক মুদ্রা ইআরকিউ অ্যাকাউন্টে রাখার সুযোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে পূর্ববর্তী সময়ে ইআরকিউ অ্যাকাউন্ট থেকে হুট করেই ডলারকে টাকায় রূপান্তর করে ফেলার মতো সিদ্ধান্ত যেন না নেওয়া হয়, সেটা নিশ্চিত করতে হবে। নীতিমালায় বেশ কিছু শঙ্কার জায়গাও রয়েছে, যা বাস্তব কাজের ক্ষেত্রে বড় বাধা হতে পারে। বিশেষ করে বিদেশে অর্থ রাখার ওপর কড়া নিষেধাজ্ঞা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার পথে অন্তরায়। আন্তর্জাতিক গ্রাহকদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নিয়মিতভাবেই যুক্তরাজ্য বা অন্যান্য দেশে নিবন্ধিত ব্যবসার অধীন বিজনেস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে দ্রুত অপারেশনাল খরচ মেটাতে হয়। অর্জিত সব অর্থ সঙ্গে সঙ্গে দেশে আনার বাধ্যবাধকতা এই ধরনের বৈশ্বিক বিজনেস মডেলে বড়সড় ধাক্কা। এ ছাড়া ফ্রিল্যান্সারের প্রোফাইল ও কাজের যোগ্যতা যাচাইয়ের ক্ষমতা ব্যাংকের হাতে দেওয়ায় হয়রানির ঝুঁকি বাড়ছে। কারণ, হাজারো ধরনের অনলাইন জটিল কাজের ধরন সম্পর্কে বাস্তবে সাধারণ ব্যাংক কর্মকর্তাদের পর্যাপ্ত কারিগরি ধারণা থাকে না।’

ব্যাংকগুলোকে প্রযোজ্য ক্ষেত্রে সরাসরি কর কেটে নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে আইটি সেবায় কর মওকুফ থাকলেও ব্যাংকের ভুল–বোঝাবুঝির কারণে পেমেন্ট থেকে অহেতুক টাকা কাটা যাওয়ার শঙ্কা থাকে বলে উল্লেখ করেন কাজী মামুন। তিনি বলেন, সরাসরি কর কর্তন বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স আনার প্রক্রিয়াকে জটিল ও নিরুৎসাহিত করতে পারে। ফ্রিল্যান্সারদের কাজের পথ মসৃণ করতে ওপরে এই ব্যাপারগুলো পুনর্বিবেচনা করা জরুরি।

সম্পূরক খবর
- Advertisment -
Google search engine

জনপ্রিয় খবর

মন্তব্য